সালমান বনাম সালমা: একজন হারলেও এমপি হতে পারেন দুজনেই

ভোটের ময়দান

নবাবগঞ্জ উপজেলার বর্দ্ধনপাড়ায় জাতীয় পার্টির নির্বাচনী অফিসে যখন পৌঁছাই, তখন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২টা পেরিয়ে গেছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) আসনে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী সালমা ইসলাম তখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার জন্য কী কী করবেন। বললেন, এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্মার্ট করে তুলবেন। গ্রামগুলোকে মডেল টাউনের আদলে গড়বেন। প্রশাসন যেন মানুষকে হয়রানি না করে, সেটা নিশ্চিত করবেন।

সবাইকে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সালমা ইসলাম বললেন, ভোটকেন্দ্রে যদি এবার কেউ কোনো ‘দুষ্টামি’ করে, তাহলে খবর আছে। এই আসনের ভোটের ওপর অনেকের নজর আছে। বক্তৃতার শেষে বললেন, ‘একজন নারী হিসেবে, মা হিসেবে, বোন হিসেবে, ভাবি হিসেবে একটি ভোট আমি আপনাদের কাছে আশা করি।’ উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের স্লোগানে মুখর হয়ে উঠল এলাকা।

ঢাকা-১ আসনে মোট সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও লড়াই হবে মূলত নৌকা ও লাঙ্গলের মধ্যে। নৌকার প্রার্থী একাদশ সংসদের সদস্য, দেশের অন্যতম বড় শিল্প গ্রুপ বেক্সিমকোর কর্ণধার এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান। লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী সালমা ইসলাম সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান, যমুনা গ্রুপের কর্ণধার এবং যুগান্তরের সম্পাদক।

অন্য প্রার্থীরা হলেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির আব্দুল হাকিম (আম), তৃণমূল বিএনপির মুফিদ খান (সোনালী আঁশ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির করম আলী (কাস্তে), গণফ্রন্টের শেখ মো. আলী (মাছ) ও বাংলাদেশ সুপ্রীম পার্টির সামসুজ্জামান চৌধুরী (একতারা)।

বাজারে চায়ের দোকানে চা খেতে বসে কথা হলো কয়েকজনের সঙ্গে। কিন্তু দোকানে থাকা ব্যক্তিরা ভোটের ব্যাপারে কথা বলতে কেমন যেন দোনোমনা করছিলেন। একজন বললেন, ভোট নিয়ে এবার সাধারণ মানুষের আগ্রহ কম। যাঁরা দল করেন, যাঁরা কিছু নগদ পান, তাঁরাই বেশি উৎসাহী।

মধ্যবয়সী এক নারীকে জিজ্ঞেস করলাম, ভোট দেবেন? বললেন, অবশ্যই। কোন প্রার্থীর অবস্থা ভালো, জানতে চাইলে বললেন, এবার এখানে লড়াই হবে নৌকা আর লাঙ্গলে। ধানের শীষ থাকলে হতো নৌকা ও ধানের শীষের লড়াই।

নৌকা ও লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী যেভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন, গ্রাম বৈঠক, উঠান বৈঠক করছেন; অন্য প্রার্থীদের তেমন তৎপরতা নেই। তবে এলাকায় সব প্রার্থীরই পোস্টার দেখা গেল।

২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনেও এই আসনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল। আবদুল মান্নান খানের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়ে সালমা ইসলাম মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমা ইসলামকে পরাজিত করেন সালমান এফ রহমান। তবে জাপার পক্ষ থেকে সালমা ইসলাম সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। এবারও সমানতালে প্রচার চালাচ্ছেন এই দুই হেভিওয়েট প্রার্থী। দুজনই এক দিন পরপর দুই উপজেলায় ভোটার, কর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে উঠান বৈঠক এবং গণসংযোগ করছেন। এখন পর্যন্ত এই আসনের কোথাও অপ্রীতিকর কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

বিকেলে যাই বান্দুরা ইউনিয়নের মালাশিকান্দায় সালমান এফ রহমানের একটি কেন্দ্রভিত্তিক মতবিনিময় সভায়। ঢাকঢোল বাজিয়ে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সভা শুরুর আগে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। কয়েক শ নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে সালমান এফ রহমানও বললেন, তিনি গত পাঁচ বছরে কী কী করেছেন, আগামী দিনে কী কী করবেন। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিলেন কর্মীদের।

দোহারের জয়পাড়া বাজারে কথা হলো বেশ কয়েকজনের সঙ্গে। নাম গোপন রাখার শর্তে অবসরপ্রাপ্ত একজন চাকরিজীবী বললেন, এই এলাকায় সাংগঠনিক দিক দিয়ে এগিয়ে আওয়ামী লীগ। তবে জনপ্রিয় বেশি সালমা ইসলাম। তবে এবার সালমান এবং সালমা দুজনেই এমপি হবেন। এটা কীভাবে সম্ভব, জানতে চাইলে বললেন, ভোটে জেতানো হবে নৌকাকে। সালমা ইসলাম পরে মহিলা আসনে এমপি হবেন।

এই কথা বলে ভদ্রলোক চোখে চোখে যেন কিছু বললেন। আমার কেবল মনে হলো, ‘চোখের সে ভাষা বুঝতে হলে চোখের মতো চোখ থাকা চাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *