ফিরে দেখা-মঞ্চাঙ্গন ছিল নানামুখী কর্মকাণ্ডে ভরপুর

শিল্প ও সাহিত্য

নাটক মঞ্চায়ন, নতুন দল ও নতুন নাটক মঞ্চে আসা, নাটকে প্রণোদনা, নাট্য পুরস্কার, প্রকাশনা, উৎসবসহ নানামুখী কাজে এ বছর মঞ্চাঙ্গন ছিল কর্মযজ্ঞে ভরপুর। করোনা পরবর্তীকালে এক বছরে ত্রিশের অধিক নতুন নাটক মঞ্চে আসা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক ব্যাপার। এই সুবাদে বেশ কয়েকজন নতুন পরিচালক, লেখক, অভিনয়শিল্পীরও আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এ বছর।

নতুন নাটক ও নাটকের দল
বছরের শুরুতেই মঞ্চে নতুন নাটকের সাক্ষী হয় দর্শক। জানুয়ারিতে উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’কে মূকাভিনয়শিল্পে মুড়িয়ে মঞ্চে এনেছে স্বপ্নদল। জার্মান লেখক হাইনার মুলারের ‘হ্যামলেট মেশিন’ নিয়ে আসে নতুন দল অ্যাক্টোম্যানিয়া। আলী যাকের নতুনের উৎসবের মধ্য দিয়ে মঞ্চে আসে পাঁচটি নতুন নাটক—হৃৎমঞ্চ রেপার্টরির ‘রিমান্ড’, থিয়েটার ফ্যাক্টরির ‘দ্য রেসপেক্টফুল প্রস্টিটিউট’, বটতলার ‘সখী রঙ্গমালা’, তাড়ুয়ার ‘আদম সুরত’ ও প্রাচ্যনাটের ‘অচলায়তন’। বছরজুড়েই নিয়মিত বিরতিতে নতুন নাটক আসে মঞ্চে।

বছরটি শেষও হয়েছে নতুন নাটক দিয়ে। ২৯ ডিসেম্বর মঞ্চে আসে মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের নাটক ‘সুরেন্দ্রকুমারী’। বেশ কয়েকজন নাট্য সমালোচক ও নাট্যজনদের বিবেচনায় বছরব্যাপী যেসব নাটক আলোচিত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—রিমান্ড, সখী রঙ্গমালা, অচলায়তন, আদম সুরত, স্বর্ণবোয়াল, সিদ্ধার্থ, হার্মাসিস ক্লিওপেট্রা, দ্য রেসপেক্টফুল প্রস্টিটিউট, লাভ লেটারস, ভগবান পালিয়ে গেছে ইত্যাদি। অ্যাক্টোম্যানিয়া, অন্তর্যাত্রা, একলব্য রেপার্টরি, কনটেমপোরারি থিয়েটার আর্টস, নৃ প্রাঙ্গণসহ কয়েকটি নতুন দলও আত্মপ্রকাশ করেছে। 

উৎসব ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা
বছরের শুরুতেই ছিল ‘আলী যাকের নতুনের উৎসব’। পাঁচটি দলকে দেওয়া হয় প্রণোদনা। তারা আনে নতুন পাঁচটি নাটক। চার গুণী নাট্যজন মামুনুর রশীদ, মাসুদ আলী খান, নাসির উদ্দিন ইউসুফ ও সৈয়দ জামিল আহমদকে দেওয়া হয় সম্মাননা। গঙ্গা-যমুনা সাংস্কৃতিক উৎসবে ছিল চার হাজার শিল্পীর অংশগ্রহণ। বাংলা নাটকের বড় দুটি দল আরণ্যক ও ঢাকা থিয়েটার আয়োজন করে ৫০ বছর পূর্তি উৎসব। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ১৫০ বছর পূর্তি হয় বাংলা সাধারণ রঙ্গালয়ের। কলকাতা ও ঢাকা মিলে বছরজুড়েই ছিল এর কার্যক্রম। এ উপলক্ষে মঞ্চে আসে বাংলা থিয়েটারের নাটক ‘নীল দর্পণ’। এ নাটক দিয়েই সাধারণ রঙ্গালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। 

রামেন্দু-ফেরদৌসী জুটি ও নূরের ফেরা
এ বছর মঞ্চে বেশ কজন খ্যাতিমান অভিনেতাদের নিয়মিত দেখা গেছে। রামেন্দু মজুমদার ও ফেরদৌসী মজুমদার দম্পতি আগে থেকেই নাটকে নিয়মিত। এবার জুটি হয়ে অভিনয় করলেন ‘লাভ লেটারস’ নাটকে। নির্দেশনা দিয়েছেন তাঁদের সন্তান ত্রপা মজুমদার। আসাদুজ্জামান নূরকে দুটি নতুন নাটকে দেখা গেল এ বছর। হৃৎমঞ্চের ‘রিমান্ড’ ও থিয়েট্রেক্সের ‘স্বর্ণবোয়াল’ নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। 

মঞ্চে পুরস্কার
দেশ নাটকের উদ্যোগে এ বছর পুরস্কারের আয়োজন করা হয় প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব ইশরাত নিশাতের নামে। ‘ইশরাত নিশাত নাট্য পুরস্কার’-এ সেরা প্রযোজনা হয়েছে বাতিঘরের ‘মাংকি ট্রায়াল’। দেশের থিয়েটার অঙ্গনের ‘বিদ্রোহী কণ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন ইশরাত নিশাত। তিনি অভিনেত্রী নাজমা আনোয়ারের মেয়ে। তাঁর মৃত্যুদিনে প্রতিবছর ইশরাত নিশাত নাট্য পুরস্কার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। 

ফেডারেশন বিতর্ক
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনে নাট্যজন কামাল বায়েজীদ ও রফিকুল্লাহ সেলিমকে অব্যাহতি দেওয়ারকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বিতর্ক। সেই বিতর্কের উত্তাপ ছিল বছরজুড়ে। সেটি গড়ায় ফেডারেশনের বর্তমান ও সাবেক নেতাদের মধ্যে চিঠি চালাচালি ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনে ভাঙনেরও আশঙ্কা দেখা দেয়। নাট্যকর্মীদের নানামুখী উদ্যোগেও সংকট সমাধান না হলে ফেডারেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় ঢাকা থিয়েটার। 

প্রকাশনা
২৭ জন লেখকের লেখা নিয়ে নবযুগ প্রকাশনী প্রকাশ করেছে বিশেষ গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের নাট্যচর্চার পাঁচ দশক’। সম্পাদনায় অভিজিৎ সেনগুপ্ত। ‘থিয়েটার পত্রিকার সম্পাদকীয় সংকলন ৫০’ নামে কথাপ্রকাশ থেকে একটি বই বেরিয়েছে। বইটির লেখক রামেন্দু মজুমদার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *