দোষ না করেও শাস্তি পেলাম, এই দুঃখটা রয়ে গেল: রায়ের পর ড. ইউনূস 

বাংলাদেশ

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আজকে ইংরেজি বছরের প্রথম দিন। সারা দুনিয়া এটা পালন করে। এটা আনন্দের দিন হিসেবে সবাই উৎসব করে। দোষ না করেও এই দিনে আমরা শাস্তি পেলাম। এই দুঃখটা রয়ে গেল। আনন্দের দিনে এই আঘাতটা পেলাম। রায় ঘোষণার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর প্রতিক্রিয়ায় একথা বলেন। 

আজ সোমবার ঢাকার শ্রম আদালত-৩-এর বিচারক শেখ মেরিনা সুলতানা এই রায় ঘোষণা করেন। 

ড. ইউনুস বলেন, ‘আমরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব।’ ড. ইউনুস আরও বলেন, ২০২৪ সালের প্রথম দিন আজ। আমরা আজকে আদালতে এসেছিলাম রায় শোনার জন্য। কিন্তু এসে মন ভরে গেল। আমার বহু বন্ধুবান্ধব এখানে পেয়ে গেলাম, যাদের সঙ্গে বহুদিন দেখা হয়নি। আমি খুবই খুশি তাদের দেখে। অনেকের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার সুযোগ পেলাম। সবাই রায়ের জন্য অপেক্ষা করলাম। কিন্তু যে রায় পেলাম সেটা আশা করিনি। আমাদের কপালে ছিল আর কি। আমরা সেটা গ্রহণ করলাম। তবে শেষ পর্যন্ত বিচার পাব। 

রায় ঘোষণার আগে শ্রম আদালতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। দুপুর দেড়টার দিকে ড. ইউনুসসহ চার আসামি আদালতে আসেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিক আদালতে হাজির ছিলেন। 

রায়ে বলা হয়, শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। শ্রম আইনের ৩০৩-এর ৩ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে চারজনকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা দিতে ব্যর্থ হলে প্রত্যেককে ১০ দিনের কারাভোগ করতে হবে বলে রায় বলা হয়। 

অন্যদিকে শ্রম আইনের ৩০৭ ধারায় প্রত্যেককে পঁচিশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। এই টাকা পরিষদে ব্যর্থ হলে ১৫ দিন কারা ভোগ করতে হবে বলে রায় বলা হয়। 
 
গত ২৪ ডিসেম্বর ড. ইউনূসসহ চারজন এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করেন। গত বছরের ১৬ নভেম্বর এই মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। এর আগে ৯ নভেম্বর ড. ইউনূসসহ চারজন আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। 

এর আগে ২০২৩ সালের ৬ জুন এই মামলায় চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। অভিযোগ গঠনকে চ্যালেঞ্জ করে ড. ইউনূসের পক্ষে হাইকোর্টে আবেদন জানালে হাইকোর্ট ওই আবেদন খারিজ করেন। পরে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। 

আদালতে ড. ইউনূসসহ চারজনের পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন, ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ ও অ্যাডভোকেট এস এম মিজানুর রহমান মামলা পরিচালনা করেন। 

অন্যদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বরত চিফ প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী মামলা পরিচালনা করেন। 

 ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক আরিফুজ্জামান বাদী হয়ে ড. ইউনূসসহ চারজনের নামে এ মামলা করেন। মামলায় শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেওয়া, শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করায় শ্রম আইনের অভিযোগ আনা হয়। 

মামলাটি ২০২১ সালে দায়ের হওয়ার পর এটা বাতিলের জন্য ড. ইউনূস হাইকোর্টে আবেদন করেন। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুল দেন। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। ওই আবেদনের শুনানি নিয়ে মামলা বাতিলে জারি করা রুল দুই মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। 

 ২০২২ সালের ১৭ আগস্ট হাইকোর্টের বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি ফাহমিদা কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ মামলা বাতিলে ইউনূসের আবেদনে জারি করা রুল খারিজ করে রায় দেন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূস আপিল বিভাগে আবেদন করেন। আপিল বিভাগ গত বছর ৮ মে ড. ইউনূসের আবেদন খারিজ করে দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *